বিলাসী গল্পটি এইচএসসি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র বিলাসী একজন নিচু বর্ণের সাপুড়ের মেয়ে। সমাজে তার অবস্থান অবহেলিত হলেও, তার মানবিকতা ও সেবার মনোভাব অসাধারণ। গল্পে দেখা যায়, উচ্চবংশীয় যুবক মৃত্যুঞ্জয় অসুস্থ হয়ে পড়লে বিলাসী নিঃস্বার্থভাবে তার যত্ন নেয় এবং তাকে সুস্থ করে তোলে। বিলাসীর আন্তরিকতা ও সেবার প্রভাবেই মৃত্যুঞ্জয় তার প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং তাকে ভালোবেসে বিয়ে করে।
তবে মৃত্যুঞ্জয়ের স্বার্থপর ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন খুড়া তাদের সম্পর্ক মেনে নিতে পারেনি। সে গ্রামে নানা ধরনের অপবাদ ছড়িয়ে দেয় এবং বিলাসীর হাতে ভাত খাওয়াকে কেন্দ্র করে ‘অন্নপাপ’ অভিযোগ তোলে। খুড়ার উসকানিতে গ্রামবাসীরা মৃত্যুঞ্জয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত তাকে গ্রাম থেকে বিতাড়িত করে। এভাবেই গল্পটি সমাজের জাতপাত, কুসংস্কার ও মানবিক মূল্যবোধের সংঘাতকে গভীরভাবে ফুটিয়ে তোলে।
বিলাসী গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন উত্তর (১)
ছোট আফসান টেলিভিশনে একটি সিনেমার দৃশ্য দেখছিল। পর্দায় নায়িকা আবেগের সঙ্গে নায়ককে বলছিল, বিশ্বাস করো রাজা, আমি তোমাকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসি। উত্তরে নায়ক গম্ভীর কণ্ঠে জানায়, না রাণী, তা সম্ভব নয়। তুমি মালিকের পরিবারের মানুষ, আর আমি একজন চাকর। তোমরা ধনী, আমরা গরিব। তাই আমাদের প্রেম হতে পারে না। এই সংলাপ শুনে ছোট আফসান বিস্মিত হয়ে পড়ে। সে কিছুতেই বুঝতে পারল না—কেন রাজা আর রাণীর মধ্যে ভালোবাসা হতে পারবে না।
ক. মৃত্যুঞ্জয়ের মৃত্যুর পর বিলাসী কতদিন বেঁচেছিল?
উত্তর: মৃত্যুঞ্জয়ের মৃত্যুর পর বিলাসী সাত দিন বেঁচেছিল।
খ. মৃত্যুঞ্জয় গ্রামের মুখ পোড়ায় কীভাবে? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: নিচু বর্ণের সাপুড়েকন্যা বিলাসীকে বিয়ে করার কারণে উঁচু বর্ণের মৃত্যুঞ্জয়ের গ্রামের মানুষদের মান-সম্মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মৃত্যুঞ্জয় রোগশয্যায় শয্যাশায়ী থাকাকালীন বিলাসী তার পাশে থেকে প্রাণপণে যত্ন এবং সেবা প্রদান করে তাকে সুস্থ করে তোলে। বিলাসীর নিঃস্বার্থ মনোভাব ও আন্তরিকতার প্রভাবে মৃত্যুঞ্জয় তার প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং তাকে ভালোবেসে বিয়ে করে। তবে তৎকালীন সমাজ, যা উঁচু-নিচু নানা সম্প্রদায়ে বিভক্ত, এই বিয়েকে মেনে নেয়নি। তারা ঘটনাটিকে গ্রামের মুখ পোড়ানো বলে অভিহিত করেছে।
গ. উদ্দীপকের নায়ক রাজার সঙ্গে ‘বিলাসী’ গল্পের মৃত্যুঞ্জয়ের বৈসাদৃশ্য তুলে ধরো।
উত্তর: বিলাসী গল্পে মৃত্যুঞ্জয়কে একজন অসাধারণ প্রেমিকপুরুষ হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। বিলাসী নিচু জাতের মেয়ে হলেও তার প্রতি মৃত্যুঞ্জয়ের ভালোবাসা কমেনি; বরং তার প্রেমের তীব্রতায় মৃত্যুঞ্জয় নিজের জাতপরিচয়ও বিসর্জন দিতে প্রস্তুত হয়। অন্যদিকে উদ্দীপকের রাজা চরিত্রে প্রেমিকার প্রতি ভালোবাসা থাকলেও, অনুদার সমাজের সীমাবদ্ধতার কারণে সে সামাজিক বাধা অতিক্রম করার সাহস দেখাতে পারেনি।
ফলে উদ্দীপকের রাজা সামাজিক বাস্তবতার কাছে নতিস্বীকার করে প্রেমিকার ভালোবাসার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু বিলাসী গল্পের নায়ক মৃত্যুঞ্জয় কোনো বাধার সামনে মাথা নত করেনি। সমাজের বিরোধিতা উপেক্ষা করে সে নিচু বর্ণের সাপুড়েকন্যা বিলাসীকে ভালোবেসে বিয়ে করেছে। শুধু তাই নয়, ভালোবাসার মানুষটিকে পাওয়ার জন্য সে সমাজের চাপে নিজের সম্পদ ও বংশগৌরব পর্যন্ত ত্যাগ করতে দ্বিধা করেনি। মৃত্যুঞ্জয়ের এই দৃঢ়তা এবং মানবিক মানসিকতা উদ্দীপকের রাজা চরিত্রে দেখা যায় না। তবে উদ্দীপকের রাজা ও বিলাসী গল্পের মৃত্যুঞ্জয়ের মধ্যে স্পষ্ট বৈসাদৃশ্য রয়েছে।
ঘ.আফসানের মতো উদার মানসিকতার অধিকারী হলে বিলাসী-মৃত্যুঞ্জয়াকে এমন পরিণতির বিশ্লেষণ করো।
উত্তর: বিলাসী গল্পে দেখা সমাজের মানুষরা যদি উদ্দীপকের আফসানের মতো উদারচেতা হতো, তবে বিলাসী ও মৃত্যুঞ্জয় হয়তো এতটা করুণ পরিণতি মুখে দেখতেন না। গল্পে দেখা যায়, সমাজের মানুষরা কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও রক্ষণশীল। ধর্মান্ধতার প্রভাবে তাদের মন সংকীর্ণ হয়ে গেছে, ফলে তারা মানুষকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করতে পারেনি। জাতিভেদের সীমাবদ্ধতা তাদের চেতনায় প্রোথিত। এ কারণে তারা বিলাসী ও মৃত্যুঞ্জয়ের সম্পর্ককে মেনে নিতে পারেনি এবং তাদের অমানবিক আচরণকেও ধর্ম ও সম্মান রক্ষার নামে যৌক্তিক মনে করেছে।
উদ্দীপকের আফসান চিন্তায় খুবই উদার। সমাজের অপ্রয়োজনীয় জটিলতা তার শিশুমনের উপর প্রভাব ফেলতে পারেনি। তাই মানুষের শ্রেণিভিত্তিক পার্থক্য তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। এজন্য সে সিনেমার ধনী নায়িকা ও গরিব নায়কের সম্পর্ককে তুচ্ছ মনে করে। গল্পে বর্ণিত অন্যান্য মানুষের মধ্যে আফসানের বিপরীতধর্মী মানসিকতা দেখা যায়।
বিলাসী গল্পে সমাজের মানুষরা প্রেম ও মানবিক মূল্য বোঝে না। তাদের সংকীর্ণ চিন্তাধারা ও অমানবিকতার কারণে বিলাসী ও মৃত্যুঞ্জয়ের প্রেমিক যুগল করুণ পরিণতি ভোগ করেছে। মৃত্যুঞ্জয়ের মৃত্যু তারা অন্নপাপের ফল ও বিলাসীর মৃত্যু পরিহাস মনে করেছে। উদ্দীপকের আফসান এই মানুষের তুলনায় অনেক উদার ও উন্নত চিন্তাধারার অধিকারী; তার শিশুমন এখনও ভেদাভেদে প্রভাবিত হয়নি। এজন্য সে প্রেমের নিঃশর্ততা কেন বিত্ত ও শ্রেণির গণ্ডিতে বেঁধে রাখা হয় তা ভাবতে পারে।
বিলাসী গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন উত্তর (২)
সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে অপুর বিয়ে ধনাঢ্য মেয়ে চম্পার সঙ্গে ঠিক হয়েছিল। কিন্তু বিয়ের দুই দিন আগে অপুর মা-বাবা জানতে পারেন চম্পার মরহুম দাদা একসময় এতিমখানার বাবুর্চি ছিলেন। এই ইতিহাসের কারণে মা-বাবা ছেলে বিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানায়। তাদের মানসিক সংকীর্ণতা দেখে অপু গভীরভাবে মর্মাহত হয়।
ক. গোখরা সাপ পোষার শখ ছিল কার?
উত্তর: গোখরা সাপ পোষার শখ ছিল গল্পকথক ন্যাড়ার।খ. কে বলিবে এ আমাদের সেই মৃত্যুঞ্জয় – উক্তিটি বুঝিয়ে দাও ।
উত্তর: বিলাসী গল্পে কায়স্থ ঘরের সন্তান মৃত্যুঞ্জয়ের সাপুড়ে রূপ দেখে গল্পকথক ন্যাড়া উদ্ধৃতটি ব্যবহার করেছেন।
গ. উদ্দীপকের অপুর বাবা-মায়ের মানসিতার সাথে বিলাসী’ গল্পের সমাজব্যবস্থার তুলনা করো।
উত্তর: বিলাসীর সঙ্গে বিয়ের কারণে মৃত্যুঞ্জয়কে রক্ষণশীল হিন্দুসমাজ গ্রামছাড়া করে। কিন্তু সে ভয় পায়নি। কয়েক মাসের মধ্যে জাত বিসর্জন দিয়ে সে সম্পূর্ণ সাপুড়ে রূপ নেয়—গেরুয়া পাগড়ি, বড় দাড়ি-চুল, রুদ্রাক্ষ ও পুঁতির মালা। এতটাই বদলে যায় যে কায়স্থ ঘরের সন্তান হিসেবে তাকে চিনতে কষ্ট হয়। গল্পকথক ন্যাড়া এই পরিবর্তনই দেখিয়েছেন।
উদ্দীপকের অপুর মা-বাবার সংকীর্ণ মানসিকতা ‘বিলাসী’ গল্পের বর্ণভেদপূর্ণ সমাজের কথা মনে করিয়ে দেয়। গল্পে দেখা যায়, বংশগৌরবের অহংকারের কারণে মানুষ নিজেদের ভেদাভেদের জালে আটকে রেখেছিল। এজন্য তারা মৃত্যুঞ্জয় ও বিলাসীর প্রেমকে মূল্য দিতে পারেনি এবং জাত বিসর্জনের ভয়ে তাকে গ্রামছাড়া রতে বাধ্য হয়।
উদ্দীপকের অপুর মা-বাবা তুচ্ছ কারণে অপুর বিয়ে ভাঙার চেষ্টা করেছেন, যা তাদের সংকীর্ণ মানসিকতার পরিচয় দেয়। তারা চম্পার যোগ্যতার চেয়ে পারিবারিক ইতিহাসকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। বিলাসী গল্পেও একই বিষয় দেখা যায়—উচ্চবর্ণের ছেলে মৃত্যুঞ্জয় ও সাপুড়ে মেয়ে বিলাসীর বিয়েকে সমাজ মেনে নেয়নি এবং অন্নপাপের অজুহাতে তাদের গ্রামছাড়া করেছে। অর্থাৎ অপুর মা-বাবার মনোভাব ‘বিলাসী’ গল্পের গ্রামবাসীর মতোই সংকীর্ণ।
ঘ.অপুর মর্মাহত ও লজ্জাবোধ করা কতখানি যৌক্তিক? ‘বিলাসী’ গল্প অবলম্বনে মতামত দাও।
উত্তর: বিলাসী গল্পের শিক্ষার আলোকে বলা যায়, মানবিক বোধসম্পন্ন যেকোনো ব্যক্তিই উদ্দীপকের ঘটনায় মর্মাহত ও লজ্জিত হওয়া স্বাভাবিক ও যৌক্তিক মনে করবে।
বিলাসী গল্প অনুদার ও রক্ষণশীল সমাজের প্রতিফলন। বর্ণবিভক্ত সমাজের নিষ্ঠুরতার কারণে বিলাসী ও মৃত্যুঞ্জয়ের জীবন অকালেই শেষ হয়। গ্রামবাসীর কাছে মানুষের আশা-স্বপ্নের কোনো মূল্য নেই; তারা শুধু সমাজের কাঠামোকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে।
উদ্দীপকের অপুর মা-বাবা চম্পার ধনাঢ্য হওয়া সত্ত্বেও তার মৃত দাদার বাবুর্চি হওয়ায় বিয়ে ভাঙতে চান। তারা চম্পারের যোগ্যতা ও মানবিক মূল্যবোধের চেয়ে পারিবারিক ইতিহাসকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, যদিও তা আপত্তি করার যোগ্য নয়। তবে বিলাসী গল্পের গ্রামবাসীর সংকীর্ণ মানসিকতাও আমাদের বিবেককে একইভাবে নাড়া দেয়।
বিলাসী গল্পে বর্ণবিভক্ত সমাজের সংকীর্ণচিত্তের ভয়াবহ রূপ দেখা যায়। স্বার্থপর মানুষদের কাছে বিলাসী তার পরিচয়ের কারণে নিন্দিত হয়। উদ্দীপকের ঘটনায়ও চম্পার মৃত দাদার বাবুর্চি হওয়ার সংবাদে অপুর মা-বাবা দিশেহারা হন এবং পাত্রী হিসেবে চম্পারের যোগ্যতাও তুচ্ছ মনে হয়। অর্থাৎ উভয় ক্ষেত্রেই মানসিক সংকীর্ণতা সংবেদনশীল মনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এজন্য একজন সচেতন মানুষ হিসেবে অপুর মর্মাহত ও লজ্জিত হওয়া যথার্থ ও প্রাসঙ্গিক।
Read More: ২০২৬ সালের সরকারি ছুটি ও সাপ্তাহিক ছুটির তালিকা প্রকাশ
